Feeds:
পোস্ট
মন্তব্য

Jpeg

সেটা আশির দশকের প্রথম দিক। স্কুলের একদম নিচুর দিকের ক্লাসে পড়ি, বাবার হাত ধরে গুটি গুটি গেছি বইমেলা। তখনকার দিনে বইমেলার এত রমরমা ছিলনা, ছোট ছোট সাদামাটা ষ্টল, ইতিউতি দুচারজনের আনাগোনা। তারমধ্যেই কিছুটা রংচঙে ঝলমলে ষ্টল ‘ফ্যান্টাস্টিক’ প্রকাশনার। ওই নামে একটা কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা চালাতেন অদ্রীশ বর্ধন, অনেক বইপত্তর বিশেষ ছাড়ে বিক্রি হচ্ছিল, স্বয়ং অদ্রীশ বর্ধন সই ও দিচ্ছিলেন, আমার আবদারে বাবাও কিনে দিল তিনটে বই, তার একটার নাম ছিল ‘সবুজ মানুষ’!

Jpeg

Cover page of the book ‘sabuj manush’!

স্বীকার করতে আপত্তি নেই, বইটার অস্বস্তিকর প্রচ্ছদ আর নিচে লেখা ‘সত্যজিৎ রায়’ এর নাম, এই দুটোই ছিল মুখ্য আকর্ষণ! প্রচ্ছদে অবশ্য সত্যজিৎ ছাড়াও ছিল আরও তিনটে নাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অদ্রীশ বর্ধন এবং দিলীপ রায়চৌধুরী। ‘সবুজ মানুষ’ – এই কমন থীমের ওপর চারজনেই একটা করে অধ্যায় লিখেছিলেন, সেগুলো মিলে তৈরী হয়েছিল কল্পবিজ্ঞানের গল্প ‘সবুজ মানুষ’, আর তাদের নিজেদের গলায় সেই গল্পের পাঠ সম্প্রচারিত হয়েছিল আকাশবাণীর ‘সাহিত্যবাসর’ অনুষ্ঠানে, সেই ১৯৬৬ সালে – এসব ওই বই থেকেই জানতে পারা! ওই চারটে অধ্যায়ের গল্প আর আনুষঙ্গিক আরো কিছু গল্প নিয়েই ‘সবুজ মানুষ’ সংকলনটা করা হয়েছিল।

সত্যজিৎ তো বটেই, প্রেমেন্দ্র মিত্র বা অদ্রীশ বর্ধনও সেই সময় আমার কাছে বেশ পরিচিত নাম, কিন্তু কে এই দিলীপ রায়চৌধুরী? তার অধ্যায়ের গল্পটা তো বাকিদের তুলনায় কোনও অংশে কম নয়! কিন্তু তার লেখা অন্য কোনও গল্প তো কোন ছাড়, ওই নামের কোনও লেখকের উল্লেখই তো পাইনা কোথাও! দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে এসে, অবশেষে উত্তর মিলল ছোট্ট বয়েসের সেই ধাঁধার!  

হ্যাঁ, ওই ১৯৬৬ তেই মারা গিয়েছিলেন দিলীপ, মাত্র ৩৭ বছর বয়েসে, আর সেইসঙ্গে হারিয়ে গেছিলেন বাংলার সাহিত্যজগৎ থেকেও। তবে হ্যাঁ, একটা ‘লীগ্যাসি’ রেখে গেছিলেন ঠিকই! তার কন্যা, বর্তমান বাংলা সাহিত্যজগতে অতিপরিচিত যশোধরা রায়চৌধুরীই ফিরিয়ে আনলেন দিলীপকে, আবার উৎসাহী পাঠকদের মাঝে!

ফেসবুকের কল্যাণে আগেই জানতে পেরেছিলাম যে এবারে বইমেলায় বেরোচ্ছে ‘দিলীপ রায়চৌধুরী রচনা সমগ্র’। উৎসাহের চোটে প্রি-অর্ডার ও করে রেখেছিলাম। তারপর তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা গেল ২০৮ পৃষ্ঠার এই বই – পরতে পরতে উন্মোচিত হলেন ব্যক্তি দিলীপ এবং তার কল্পনার জগৎ!

Jpeg

Illustration by Sumit Roy

কেমন সেই জগৎ? ভয়ানকভাবে ‘ডার্ক’! সেই জগৎ ঘিরে থাকে অজানা বিভীষিকা, সেখানে পদে পদে অনিশ্চয়তা আর ধ্বংসের আশঙ্কা, প্রাণপাত সংগ্রামের শেষে মেলে কেবল সাময়িক স্বস্তি! লেখক যেন প্রতিমুহূর্তে ধরিয়ে দিতে চান যে পৃথিবীর এই আপাত শান্তির বাতাবরণ আসলে কতটা বিভ্রান্তিকর, কতটা অসুরক্ষিত! আটটি গল্প আর একটি উপন্যাসে বিবৃত এই কাল্পনিক জগতে বারেবারে ফিরে আসে এই থীমটাই! এই বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ্য ‘নেরগাল’ গল্পটি, এমন জায়গায় গিয়ে শেষ হয় যে পাঠকের শিউরে উঠে খানিক্ষন চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার থাকেনা!

দিলীপের লেখালিখির সময়কাল ১৯৬৩-৬৬, আর গবেষণাসূত্রে আমেরিকায় বসবাস ১৯৫৩-৫৭। দিলীপের কল্পনার জগৎ কেন এমন, সেই প্রশ্নের উত্তর কি লুকিয়ে আছে এই কালপঞ্জীতেই? মনে রাখতে হবে দিলীপ কিন্তু গল্পে কোনও ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ছবি আঁকেন না, তার গল্পের পটভূমি মোটামুটি ৬০-এর দশকেরই পৃথিবী, গল্পের ‘প্রোটাগনিস্ট’ও কতকটা নিজের আদলেই তৈরী! হয়ত ব্যক্তিগত চিঠিগুলো প্রকাশিত হলে এবিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

কল্পবিজ্ঞানের গল্প লেখার একটা থাম্বরুল হল বৈজ্ঞানিক তথ্যের মধ্যে কোনও ভেজাল দেওয়া চলবেনা! এই নিয়ম অনুসরণের ক্ষেত্রে দিলীপের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাতেও তার যাতায়াত অবাধ। শুধু তাই নয়, খুব সমসাময়িক গবেষণার বিষয়বস্তুও তিনি অতি স্বচ্ছন্দে নিয়ে আসেন তার গল্পে। আর বিজ্ঞান-গবেষণার দুনিয়ার ছোটখাট খুঁটিনাটি তিনি এতো অনায়াসে তুলে আনেন যে পড়লেই বোঝা যায় যে লেখক নিজেই একজন বৈজ্ঞানিক। এই ক্ষমতা তাকে বাকি লেখকদের থেকে কিছুটা স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে এটা বলাই যায়!

কিন্তু শুধু একজন বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবেই নয়, একজন গল্প-বলিয়ে হিসেবেও দিলীপের দক্ষতা অনস্বীকার্য। ঝরঝরে ভাষায় লেখা গদ্য, পাঠক এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেন! ‘অগ্নির দেবতা হেফেস্টাস’ উপন্যাসে তিনি যে সাবলীলতায় কাহিনীকে স্তরে স্তরে গড়ে তোলেন, তা ঈর্ষণীয়। তার ‘অন্য রচনা’র অন্তর্গত ‘চিত্ত ভাবনাহীন’ নামের আত্মজৈবনিক(?) গল্পে জীবন সম্পর্কে সহজাত নির্লিপ্তি মন টেনে নেয়। উল্টে বরং বলা যায়, যেটা একেবারে শুধুই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ, সেই ‘চল যাই যাদুঘরে’তেই বরং তিনি কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট। সব মিলিয়ে, তার অকালপ্রয়াণে বাংলা সাহিত্য যে বিশেষভাবে বঞ্চিত হয়েছে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

Jpeg

Illustration by Sumit Roy

ডক্টর দিলীপ রায়চৌধুরী র পুনর্নির্মাণের জন্য বাংলা সাহিত্য তার কন্যা যশোধরার কাছে ঋণী থাকবে, তার সুলিখিত মুখবন্ধটা ছাড়া পুরো ব্যাপারটা অসম্পূর্ণ থেকে যেত। রচনাপঞ্জীতে কিছু ইনকনসিস্টেন্সি চোখে পড়ল, সব রচনার প্রকাশকাল দেওয়া নেই; মুখবন্ধে বলা আছে উপন্যাসটা ‘আশ্চর্য্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত, কিন্তু রচনাপঞ্জীতে শুধু ১৯৬৫! ডঃ রায়চৌধুরীর একটা ফটোগ্রাফ দেওয়া গেলে পাঠকরা একটা ধারণা পেতেন। সুমিত রায়ের করা অলংকরণ কাহিনীর পরিবেশ যথাযথ ফুটিয়ে তোলে। তবে বইমেলার ডেডলাইন ছিল বলেই বোধহয়, তাড়াহুড়োয় কিছু মুদ্রণপ্রমাদ রয়ে গেছে। ডঃ সঞ্জয় বোস মুখবন্ধে ভ্রমবশতঃ হয়ে গেছেন চৌধুরী, ৪৮ পৃষ্ঠার শেষ বাক্যটি কমপ্লিট হয়নি, ইত্যাদি।

তবে একটা প্রশ্ন রয়েই গেল! ‘সবুজ মানুষ’ অগ্রন্থিত কেন? কোনও কপিরাইট জনিত সমস্যা কি? যতই সবজায়গায় বারোয়ারি গল্প বলা হোক না কেন, আসলে তো চারজনের লেখা চারটি আলাদা অধ্যায়, কোনও ‘কন্টিনিউএশন’ ও নেই! আর লিখিত আকারে প্রকাশিত ও!

আর একটা কথা। ‘অগ্নির দেবতা হেফেস্টাস’ কিন্তু দারুন সিনেমা হয়! ভবিষ্যতে কোনও ভাল পরিচালক হয়ত এই কাহিনীর প্রত্যাশার প্রতি সুবিচার করবেন, এই আশা রাখি।

‘দিলীপ রায়চৌধুরী’ রচনা সমগ্র’ পাওয়া যাচ্ছে ‘সৃষ্টিসুখ’ থেকে।

Jpeg

Screenshot from 2017-04-07 14:54:41

গত ২৬শে মার্চ, ২০১৭ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এই খবরটা হয়ত অনেকে দেখেছেন – পাসপোর্ট করাতে ঘুষের অভিজ্ঞতা নেতা-মন্ত্রীদেরও”। অসম বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার নিজেই বর্ণনা করেছেন তাঁর অভিজ্ঞতা, কীভাবে নিজের স্ত্রীর পাসপোর্ট করার সময় জেলাশাসকের অফিস থেকে ফাইল নড়াতে তাঁকে দেড়টি হাজার টাকা নজরানা দিতে হয়েছিল! নেতা-নেত্রীদেরই যখন এই অবস্থা, তখন সাধারণের কী হাল সেটা বলাই বাহুল্য।

br2তাছাড়া শুধু কি পাসপোর্ট? সরকারের বিভিন্ন দফতরে, যেমন বাড়ির নকশা অনুমোদন করাতে গিয়ে, অথবা নতুন ইলেকট্রিক কানেকশন নিতে গিয়ে, ইনকাম ট্যাক্স রিফান্ড এর সময়, কিংবা কোনো সরকারী প্রকল্পে নিজের অন্তর্ভুক্তির সময়, নিত্যদিনই এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যে সুবিধা দেশের নাগরিক হিসেবে আইনত-ই প্রাপ্য, তারই জন্য গুনতে হচ্ছে টাকা! মানুষ দিয়েও দিচ্ছেন, কারণ তারা ভালোই জানেন যে এই দাবি না মানলে কপালে জুটতে পারে অযথা হয়রানি! তারা এটাও জানেন যে কাজটা অপরাধ, হয়ত মনে মনে ভাবছেন যে এই অসৎ অফিসার গুলোকে ধরিয়ে দিতে পারলে বেশ হত! কিন্তু ততটা দুঃসাহসী হতে পারছেননা, কারণ যে মুহুর্তে তিনি ঘুষটা দিয়ে ফেলছেন, হয়ে পড়ছেন অপরাধের একজন অংশীদার। আইনের চোখে ভুক্তভোগী নাগরিক আর ওই সরকারী অফিসার দুজনেই সমান অপরাধী, দুজনেরই শাস্তি হতে পারে ছ’মাস থেকে পাঁচ বছরের জেল, সঙ্গে জরিমানা! তাই নিঃশব্দে ঘটনাটা চেপেই যাচ্ছেন।

br3আচ্ছা যদি এমন হত, ঘুষ দেওয়ার পরে গিয়ে অভিযোগ করলে যিনি ঘুষ দিচ্ছেন তার কোনও শাস্তি হতনা, দোষ প্রমাণিত হলে শাস্তি হত শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসারের? এইরকম আইন কিন্তু একেবারে অলীক কল্পনা নয়! চীন, জাপান বা রাশিয়াতে এইধরণের আইন চালু আছে, যিনি ঘুষ দিচ্ছেন তিনি অনেক কম শাস্তি পান যিনি ঘুষ নিচ্ছেন তার তুলনায়! আবার ভারতবর্ষের মত আইন রয়েছে ইউএসএ, ইউকে বা ফ্রান্স এর মত দেশেও, যেখানে শাস্তির ক্ষেত্রে দুপক্ষের মধ্যে ফারাক করা হয়না। কিন্তু কোন পলিসি টা বেশি কার্যকরী, এই নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।

KaushikBasu

Dr. Kaushik Basu, President: International Economic Association

ঠিক এইরকমই একটা কথা বলেছিলেন বিশিষ্ট বাঙালি অর্থনীতিবিদ কৌশিক বাসু, ইউপিএ জমানায় যিনি ছিলেন দেশের চিফ ইকনমিক এডভাইসার, সামলিয়েছেন বিশ্বব্যাঙ্কের চিফ ইকনমিস্ট পদ,আর এখন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সঙ্ঘের প্রেসিডেন্ট। তার প্রস্তাব ছিল, ক্ষেত্র বিশেষে ঘুষ দেওয়াটা আইনসিদ্ধ করে দেওয়া হোক [1]! তার মানে অবশ্য এই নয় যে কেউ ঘুষ দিয়ে কোনো অন্যায় সুবিধা নেবেন আর তার কোনো সাজা হবেনা! কৌশিকের প্রস্তাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র যে সরকারী পরিষেবা গুলো আইনত মানুষের প্রাপ্য, সেগুলো পেতে গিয়ে যদি কেউ ঘুষ দিতে বাধ্য হন, তাহলে আইনের চোখে ঘুষদাতা অপরাধী হবেন না, দোষী হবেন শুধু সেই অফিসার যিনি ঘুষ নিয়েছেন! শুধু তাই নয়, দেওয়া ঘুষের টাকাটাও অফিসার এর থেকে কেড়ে নিয়ে অভিযোগকারীকে ফেরত দিয়ে দেওয়া হবে। বাসুর যুক্তি, যে এরকম একটা আইন থাকলে সাধারণ নাগরিকও অভিযোগ জানাতে উৎসাহ পাবেন, আর লোভী অফিসারও ঘুষ চাইবার আগে দুবার ভাববেন। এভাবে চলতে চলতে এই ধরণের ঘটনাই যাবে কমে!

supratim

Dr. Supratim Sengupta, Associate Professor, IISER-Kolkata

কিন্তু সত্যিই কি ব্যাপারটা এতটাই সহজ? কীভাবেই বা জানা যেতে পারে যে এরকম আইন বানালে সেটা সফল হবে কিনা? মানুষের সমাজ তো আর বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরি নয় যে সেখানে ইচ্ছেমত এক্সপেরিমেন্ট চালানো যাবে! ঠিক এখানেই পরিত্রাতা হয়ে উঠতে পারেন গণিতজ্ঞ, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ আর পদার্থবিদরা। কাগজে কলমে, অথবা কম্পিউটার এর প্রোগ্রাম এ, তারা তৈরী করে ফেলতে পারেন কৃত্রিম সমাজের মডেল, যেখানে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে করে দেখে নেওয়া সম্ভব যে কিভাবে সময়ের সাথে সাথে মানুষের স্ট্রাটেজি পাল্টায়, আর কোন স্ট্রাটেজি ই বা শেষমেষ জয়ী হয়। আর এই সমস্ত কিছু করা যায় ‘ইভলিউশনারি গেম থিওরি’ মডেলের সাহায্যে [2]।

prateek

Prateek Verma, PhD student, IISER-Kolkata

ঠিক এই বিষয় নিয়েই বর্তমানে গবেষণায় ব্যস্ত আছেন কলকাতার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স এডুকেশন এন্ড রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক সুপ্রতিম সেনগুপ্ত এবং তার ছাত্ররা। সুপ্রতিম এবং তার ছাত্র প্রতীক ভার্মা অঙ্ক কষে এবং কম্পিউটার সিমুলেশন এর মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে সাধারণ মানুষের এই হয়রানি দূর করতে শুধু ওইরকম একটা আইনই যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ না অভিযোগ জানানোর রীতিনীতি সরল হবে, শাস্তিদানের হার হবে দ্রুত, আর শাস্তির পরিমাণ হবে বেশি, ততক্ষণ শুধু আইন দিয়ে অসৎ অফিসারদের সংখ্যা কমান সম্ভব নয়। তাদের মতে নাগরিকরা যাতে সহজে ঘুষ চাওয়ার ঘটনা রিপোর্ট করতে পারেন তার জন্য উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরী করাটা সবার আগে জরুরি [3,4]।

ভারতবর্ষ যে এইধরণের অপরাধের আঁতুরঘর সেকথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা [5]! মোটামুটি একটা হিসেবে পাওয়ার জন্য ২০১০ সালে ‘জনাগ্রহ’ বলে এক এনজিও একটা ওয়েবসাইট চালু করেন http://www.ipaidabribe.com/ যেখানে ভারতীয়রা এইধরণের ঘটনা স্বেচ্ছায় জানাতে পারেন! এই লেখার সময় পর্যন্ত  ১৩৫০৩৯ টি রিপোর্ট জমা পড়েছে, প্রদেয় ঘুষের পরিমাণ ২৮৭৪.৬ কোটি টাকা! অর্থনীতিবিদরা বলেন যে শুধুমাত্র ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার জন্যই একটা দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ভীষণভাবে কমে যেতে পারে! মানবাধিকার লঙ্ঘন, সামাজিক বৈষম্য, হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয় জাতীয় ক্ষতির পরিমাপ তো সম্ভবই নয়। তাই এই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে চলেছেন অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা, এমনকি পদার্থবিদরাও।

তবে এখনো পর্যন্ত গবেষণায় যা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে তাতে মনে হয়না যে একক কোনো নীতি বা আইন প্রনয়ন করে এটা বন্ধ করা যাবে। তবে আশা করা যায় যে অদূর ভবিষ্যতে নীতি এবং প্রযুক্তির সঠিক মেলবন্ধনই পারবে সমাজকে এই অসুখের হাত থেকে মুক্ত করতে। আর সেই উদ্দেশ্যেই অধ্যাপক সুপ্রতিম সেনগুপ্ত এবং তার টিম কাজ করে চলেছেন।

br1

লেখার শিরোনাম সুকুমার রায়ের কবিতার একটি লাইনের অনুসারী। ফটোগ্রাফ ও অন্যান্য ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া! কৃতজ্ঞতাঃ আনন্দবাজার পত্রিকা।

তথ্যসূত্রঃ

[1] Basu K (2011) Why, for a Class of Bribes, the Act of Giving a Bribe should be Treated as Legal: অনলাইনে পাওয়া যাবে https://mpra.ub.uni-muenchen.de/50335/
[2] Roca C.P., et al. (2009) Evolutionary game theory: Temporal and spatial effects beyond replicator dynamics, Physics of Life Reviews 6 (2009) 208–249.
[3] Verma P, Sengupta S (2015) Bribe and Punishment: An Evolutionary Game-Theoretic Analysis of Bribery. PLoS ONE 10(7): e0133441.
[4] Verma P., et al. (2017) Bribery games on inter-dependent regular networks. Scientific Reports 7:42735.
[5] Dasgupta, Arindam (2009), ̳Corruption,‘ in K. Basu (ed.) Oxford Companion to Economics in India, Oxford University Press, New Delhi.

Screenshot from 2017-03-21 13:57:11

গত ১লাডিসেম্বর ২০১৬, আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটা খবর হয়ত কেউ কেউ নজর করেছেন। খবরের শিরোনাম ছিল ‘আপৎকালে নারী ভরসা, সিটুতে এ বার সভানেত্রী’। প্রথম কয়েকটা লাইন ছিল এরকম – “ভাঙতে ভাঙতে সংগঠনের অস্তিত্ব প্রায় সংকটে। মরণকালে মহিলা নাম জপে বাঁচার মরিয়া চেষ্টায় নামল সিটু! সিপিএমের শ্রমিক সংগঠনের নতুন সর্বভারতীয় সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কে. হেমলতা।” চমকপ্রদ ঘটনা সন্দেহ নেই! সংগঠনের কয়েক দশকের ইতিহাসে এই প্রথম মহিলা সভাপতি। প্রতিবেদক আর শিরোনাম-লেখক দুজনেই ঘটনাটাকে ‘অবশেষে মহিলাদের যোগ্য সম্মান প্রাপ্তি’র নিরিখে দেখেছেন, কিন্তু হয়ত নিজেদের অজান্তেই তুলে এনেছেন এক বহুল প্রচলিত আর নির্মম সত্য, সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম ‘Glass cliff effect’!

The glass ceiling

largeএমনিতে মানুষজন গুরুত্ত্বপূর্ণ সংস্থা বা সংগঠনের নেতৃত্বপদে মহিলাদের দেখতে অভ্যস্ত নন, তা সে ভারতবর্ষেই হোক বা পশ্চিমি দুনিয়ায়! খোদ মার্কিন মুলুকে মাত্র ১৬% কর্পোরেট অফিসার হলেন মহিলা, আর ‘Fortune 500’ তকমাধারী কোম্পানিগুলোর সিইও দের মধ্যে মহিলা আছেন মাত্র ১% [1,2]। সেখানে কিন্তু শ্রমশক্তিতে মহিলাদের যোগদান শেষ কয়েক বছরে অভাবিত ভাবে বেড়েছে, ১৯৯০ সালের ২০% থেকে ২০১৫ তে ৫৯% [3]। তাহলে কর্পোরেট দুনিয়ায় মহিলারা মাঝারি মাপের ম্যানেজারিয়াল স্তরেই আটকে যাচ্ছেন কীকরে? মনোবৈজ্ঞানিকদের মতে এর পেছনে রয়েছে ‘gender stereotyping’ – সাধারণভাবে মনে করা হয় মহিলারা যেন ‘leadership role’ এর তুলনায় ‘supportive role’ এর জন্যই বেশি যোগ্য [4]! একাধিক স্টাডিতে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে এই কারণে কর্পোরেট জগতে ‘মহিলা কর্মী’ এবং ‘উচ্চপদ’, এই দুইয়ের মধ্যে যেন একটা দুর্লঙ্ঘ্য দেওয়াল বিরাজ করে, যাকে পরিভাষায় বলে ‘Glass ceiling’ [5,6]!

Breaking the glass ceiling

554008075খুব কম মহিলারাই এই ‘glass ceiling’ ভেঙে নেতৃত্বপদে উঠতে পারেন। কিন্তু যাঁরা ওঠেন, সমাজ-নির্দেশিত বাঁধাধরা ভূমিকা অস্বীকার করার মূল্য তাদের চোকাতে হয়, সহ্য করতে হয় নানান প্রতিকূলতা, প্রত্যাখ্যান আর সামাজিক দন্ড (social punishment) [7]। যেমন নেতৃত্বপদে আসীন মহিলারা, একই আচরণের জন্য, সমযোগ্যতার পুরুষের তুলনায় অনেক নিকৃষ্ট মূল্যায়ন পান অধস্তন কর্মচারীদের থেকে [8]। আর যদি তাদের নেতৃত্বের স্টাইল একটু কতৃত্বপূর্ণ হয়, তাহলে তো কথাই নেই [9]। এই সোশ্যাল পানিশমেন্ট এর ভয়ে মহিলাদের নিজেদের সাফল্য লুকিয়ে রাখতে পর্যন্ত দেখা গেছে [10]। এত কিছু সামলে শেষ পর্যন্ত একমাত্র প্রকৃত সাহসী মহিলারাই গ্লাস সিলিং ভেঙে বেরোবার স্পর্ধা দেখাতে পারেন।

The glass cliff effect

glasscliff1কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে মহিলাদের পক্ষে এই ‘glass ceiling’ ভেঙে বেরোনো অপেক্ষাকৃত সহজ? বিলেতের এক্সেটর ইউনিভার্সিটির সামাজিক ও সাংগঠনিক মনোবিদ্যার দুই অধ্যাপক, মিশেল রায়ান আর আলেক্স হাসলাম, আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত একটা হাইপোথিসিস দিয়েছেন! তারা বলছেন, মহিলাদের উন্নতির জন্য ‘প্রাইম টাইম’ হল গিয়ে সংগঠনের সংকটকাল! শুধু বলেই ছেড়ে দেননি তারা, একের পর এক স্টাডির মাধ্যমে প্রমাণও করেছেন যে তাদের হাইপোথিসিস একেবারে ঠিক। সত্যি সত্যিই ‘আপৎকালে’, যখন নেতৃত্বপদ তুলনামূলকভাবে নিরাপত্তাহীন আর বিপজ্জনক, ব্যর্থতার ঝুঁকি অনেক বেশি, মহিলাদের ভাগ্যে শিঁকে ছেঁড়ার সম্ভাবনাও তখনি বেশি! এই বাস্তবতার নামই এরা দিয়েছেন ‘Glass cliff effect’ [11,12]।

michelle-sml

Prof. Michelle K. Ryan

রায়ান আর হাসলাম প্রথমেই লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত বড় বড় কোম্পানিগুলোতে ঠিক কখন কখন বোর্ড অফ ডিরেক্টর পাল্টানো হয়েছে, সেটা খুঁজে বার করেন। তারপর তারা খুঁটিয়ে দেখেন এই নতুন এপয়েন্টমেন্ট এর ঠিক আগের মাসে স্টক মার্কেটে ঐ কোম্পানির পারফরমেন্স কেমন ছিল। দেখা যায়, সত্যি সত্যিই যে কোম্পানিগুলো ধারাবাহিকভাবে খারাপ পারফর্ম করে যাচ্ছিল, সেখানেই মহিলা ডিরেক্টররা বেশি সংখ্যায় বহাল হয়েছেন [11]। যেমন Sunoco Oil এর শেয়ার এর দাম একধাক্কায় অর্ধেক হয়ে যাবার পর কোম্পানির সিইও হন লীন লেভার্টি এলসেনহাস, পুস্তকবিক্রেতা WHSmith কোম্পানির শেয়ারদর পড়ে যাবার পর কর্মী ছাঁটাই এর ঠিক আগে দায়িত্ব পান কেট সোয়ান, এইরকম আরকি।

alex-haslam_sml

Prof. Alex Haslam

আরও নিশ্চিত হবার জন্য রায়ান আর হাসলাম বেশ কিছু সাইকোলজিকাল এক্সপেরিমেন্টও করেন। সেখানেও প্রশ্নাতীতভাবে প্রমান হয় যে মহিলাদের নিযুক্ত হবার সম্ভাবনা তখনই বেশি যখন পদটা ঝুঁকিপূর্ণ [13]। এইসব ফলাফল থেকে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে যখন পুরুষের তথাকথিত সহজাত নেতৃত্বক্ষমতা কাজে আসছেনা বলে মনে হয়, তখনই মহিলারা সুযোগ পান [6]।

পরিশেষে

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে ভারতবর্ষের একটা শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বপদে বদলও আসলে একটা বিশ্বব্যাপী প্রবণতার অঙ্গ! এই সূত্রে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনের একটা লাইন বেশ প্রণিধানযোগ্য – “বাম রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের একাংশ অবশ্য বলছেন,…. সংগঠনই যখন ক্ষয়িষ্ণু, একের পর এক নির্বাচনে বিপর্যয় ঘটছে বামেদের, সেই সময়ে সভাপতি পদে মহিলা থাকলেন না পুরুষ – তা দিয়ে বিরাট কিছু এসে যাবার কথা নয়!” ডক্টর কে. হেমলতা, এবারে এই পর্যবেক্ষকদের যোগ্য জবাব দেবার দায়িত্ব কিন্তু আপনার! নিজের জোরেই গ্লাস সিলিং ভেঙেছেন আপনি, এখন গ্লাস ক্লিফের ওপর থেকেই সংগঠনকে নতুন উদ্যমে চালনা করুন। আপনার সঙ্গে রইল আমাদের সকলের শুভেচ্ছা।

Screenshot from 2017-03-30 14:06:22

এই লেখাটি আর. এ. ব্যারন এবং এন. আর. ব্রানসকম্বের ‘Social Psychology’ বই এর একটি চ্যাপ্টারের অনুসরণে লেখা। অন্যান্য ছবি ও কার্টুন ইন্টারনেটের সূত্রে প্রাপ্ত। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ আনন্দবাজার পত্রিকা।

তথ্যসূত্রঃ

[1] Catalyst census: Financial post 500 women senior officers and top earners. http://www.catalyst.org থেকে 2011 সালে নেওয়া।
[2] U.S. Bureau of Labor Statistics er website www.bls.gov/ থেকে 2007 সালে নেওয়া – ‘Women in the labor force: A databook. Report 996.
[3] U.S. Census Bureau website http://www.census.gov থেকে পাওয়া তথ্য।
[4] Eagly, A. H., & Sczesny, S. (2009) Stereotypes about women, men, and leaders: Have time changed? In M. Berreto, M. K. Ryan, & M. T. Schmitt (Eds.), The glass ceiling in the 21st century (pp. 21-47). Washington, DC: American Psychological Association.
[5] Schein, V. E. (2001) A global look at psychological barriers to women’s progress in management. Journal of Social Issues, 57, 675-688.
[6] Bruckmuller, S., & Bronscombe, N. R. (2010) The glass cliff: When and why women are selected as leaders in crisis contexts. British Journal of Social Psychology, 49, 433-451.
[7] Glick, P., & Rudman, L. A. (2010) Sexism. In J. F. Dovidio, M. Hewstone, P. Glick, & V. M. Esses (Eds.) Sage handbook of prejudice, stereotyping and discrimination (pp. 328-344). London: Sage.
[8] Lyness, K. S., & Heilman, M.E. (2006) When fit is fundamental: Performance evaluations and promotions in upper-level female and male managers. Journal of Applied Psychology, 91, 777-785.
[9] Eagly, A. H., & Karau, S. J. (2002) Role congruity theory of prejudice toward female leaders. Psychological Review, 109, 573-598.
[10] Rudman, L. A., & Fairchild, K. (2004). Reactions to counterstereotypic behavior: The role of backlash in cultural stereotype maintenance. Journal of Personality and Social Psychology, 87, 157–176.
[11] Ryan, M. K., & Haslam, S. A. (2005) ‘The glass cliff: Evidence that women are overrepresented in precarious leadership positions. British Journal of Management. 16, 81-90.
[12] Ryan, M. K., & Haslam, S. A. (2007) ‘The glass cliff: Exploring the dynamics surrounding women’s appointment to precarious leadership positions. Academy of Management Review, 32, 549-572.
[13] Ryan, M. K. et. al. (2009) The stress of working on the edge: Implications of glass cliff for both women and organizations. In M. Berreto, M. K. Ryan, & M. T. Schmitt (Eds.), The glass ceiling in the 21st century (pp. 153-169). Washington, DC: American Psychological Association.

একা বনাম কয়েকজন

singlism1

কল্যাণী শহরে বাড়িভাড়া নিতে গিয়ে একেবারে হাতেকলমেই অভিজ্ঞতাটা হয়ে গেল।

বাড়িওলা দাদা ফোনে আশ্বাস দিয়েছিলেন – পছন্দ নাকি হবেই! গিয়ে দেখলাম সত্যিই তাই – এক্কেবারে নতুন ঝাঁ-চকচকে ফ্ল্যাট, চারতলার ওপর, তায় আবার দক্ষিণ খোলা বারান্দা, আলো বাতাস ঝলমল করছে, সঙ্গে এলিভেটর, আর কী চাই? ভাড়াটা বাজেটের তুলনায় একটু বেশি পড়লেও লোভে পড়ে হ্যাঁ বলে দিলাম! যথাসময়ে এগ্রিমেন্ট সেরে চাবি হাতে পেয়ে গেলাম, কিন্তু ঘরে ঢুকতে গিয়েই খেলাম ধাক্কাটা। আবাসনের কেয়ারটেকার আমাকে জানাল আবাসিকদের মধ্যে কর্তাগোছের কিছু লোক আপত্তি করছেন, আমার বাড়িওলা তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই কেন একজন ‘ফ্যামিলি’-বিহীন ব্যক্তিকে ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছেন!!

ফোন করলাম বাড়িওলা দাদাকে। উনি অবশ্য শুনেই উড়িয়ে দিলেন – ধুর মশাই, আপনি থাকুন তো ওখানে, বেশি কিছু বলতে এলে আমি বুঝে নেব ‘খন।

একটু আশ্বস্ত হয়ে আমি তো গিয়ে কর্তাব্যক্তিদের সাথে দেখা করলাম – বৌ নেই তো হয়েছেটা কী, মেরে পাস মা হ্যায়, মা কি ‘ফ্যামিলি’ হল না নাকি?

তারাও ছাড়নেওলা নন, একজন বলে বসলেন – তাহলে আপনি লিখিত দিন যে আপনি মা কে নিয়েই এখানে থাকবেন!

আমার চামড়া কিঞ্চিৎ মোটা হলেও এই কথায় একটু আঁতে লাগলো, বলে দিলাম এরকম কিছু আমি লিখে দেবনা, সঙ্গে প্রতিবেশীর প্রতি বিশ্বাসবোধ নিয়ে দুএকটা ডায়লগ ও শুনিয়ে দিলাম!

মা সঙ্গে থাকার জন্যই এযাত্রা উতরে গেলাম, নাকি বাড়িওলা নিজের শহরে ফ্যামিলি রেখে অন্য প্রদেশে একা থাকেন বলে এই সমস্যার ব্যাপারে সহানুভূতিশীল, আর ওনার এই ফ্ল্যাটবাড়ির বাকিদের সঙ্গে ইগোর লড়াই আছে, নাকি আমার পেছনে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গবেষণাগারের ছাপ্পাই আমায় বাঁচাল – পুরোটা পরিষ্কার হলনা, কিন্তু আমি ওই ফ্ল্যাটে শেষমেশ বহাল হয়েই গেলাম।

আগে শুনেছিলাম, কিন্তু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এই প্রথম! মানুষ বৈষম্যের শিকার হয় গায়ের রঙের জন্যে, জাতি-ধর্মের ভিত্তিতে, লিঙ্গভেদে – কিন্তু আমি দুর্দশায় পড়ছিলাম স্রেফ ‘অনূঢ়’ হওয়ার অপরাধে! সত্যি বলতে এই বিশেষ ঘটনাটা একটু গোদা টাইপের, কিন্তু শুধু অবিবাহিত বলেই বৈষম্যের শিকার আমরা হয়ত আরও অনেক জায়গাতেই হয়ে থাকি, কিন্তু এত সূক্ষ্মভাবে যে সবসময় সেটা আলাদা করে চোখে পড়েনা! আমি ভুল ও হতে পারি, কিন্তু শুনেছি ‘ফ্যামিলি’ থাকলে বীমা, ঋণের কিস্তি, ভ্রমণ বা ক্লাব-মেম্বারশিপে ছাড় পাওয়া যায়, অনেক চাকরিতে আলাদা করে ‘ফ্যামিলি এলাউন্স’ দেওয়া হয় – এইরকম আরকি! আর এইসমস্ত ক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি’ থাকা মানে হল ‘স্পাউস’-এর অস্তিত্ত্ব থাকা।

singledout

Cover page of the book written by Bella DePaulo

এই উটকো নৈতিকতা রোগ শুধু কি ভারতেই? মার্কিন মুলুকের চিত্রটা কিন্তু খুব একটা আলাদা নয়! হারভার্ড ইউনিভার্সিটির পি.এইচ.ডি., বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ায় গবেষণারত মনোবৈজ্ঞানিক বেলা ডিপাউলো একটা আস্ত বই ই লিখে ফেলেছেন এই ব্যাপারে! বেলা ডিপাউলো আর তার সঙ্গীসাথী বৈজ্ঞানিকরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে অবিবাহিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে বাকি সমাজ কীরকম নেতিবাচক ধ্যানধারণা পোষণ করে! তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, বিবাহিত ব্যক্তিদের নিয়ে যেখানে গ্রহণযোগ্য ধারণা হল যে তারা পরিণত মনষ্ক, সুখী, দয়ালু আর সৎ, সেখানে অবিবাহিতদের একচেটিয়াভাবে অপরিণত, অনির্ভরযোগ্য, অসুখী আর আত্মস্বর্বস্ব বলে মনে করা হয়; বিজ্ঞানের ভাষায় এরকমভাবে এক ছাঁচে ফেলে দেগে দেওয়াকে বলে ‘negative stereotyping’। এমনকি ‘আপনার বাড়ি আপনি কাকে ভাড়া দেবেন’? – এই প্রশ্নের জবাবেও ৭০% মার্কিনি বলেছেন যে তাদের পছন্দ হল ‘বিবাহিত যুগল’!

এই বৈষম্য আর বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সেরকম প্রতিবাদ নেই কেন? বেলা ডিপাউলোরা তাদের গবেষণায় এটাও দেখিয়েছেন যে এই বিষয়ে সচেতনতা বেশ কম, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নিজেরাই বুঝতে পারেননা যে তারা আসলে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বাকিরা তো বটেই, এমনকি তারা নিজেরাও অনেক ক্ষেত্রে এইধরণের ব্যবহারকে স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত বলে ভাবেন!

বেলা ডিপাউলোরা মনে করেন এসমস্ত আচরণ আসলে পরোক্ষে ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠান টাকে টিঁকিয়ে রাখতে, আরও মহান ভাবে দেখাতে সাহায্য করে। আর ঠিক সেই কারণেই এরকম আচরণ জনসাধারণের মধ্যে এতটা ব্যাপক আকারে বৈধতাপ্রাপ্ত। মানুষের সংস্কৃতিই মানুষকে বিশ্বাস করতে শেখায় যে একটা অর্থপূর্ণ জীবনের জন্য একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী বেছে নিয়ে তাকে বিয়ে করে নেওয়াটা জরুরী, আর অবিবাহিত ব্যক্তিরা তাদের জীবন দিয়ে এই বিস্বাসটাকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তাই তাদের জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টার পেছনে লুকিয়ে আছে ‘কালচারাল মিথ’ গুলোর প্রতি বিশ্বাস আর সেগুলোকে রক্ষার তাগিদ!

পরিত্রানের উপায়? তাত্ত্বিকরা বলেন যুযুধান দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। একে অপরকে আরো বেশি করে জানলে বা বুঝলে তবেই একচেটিয়া ধারণাগুলো পাল্টাতে পারে। ততদিন পর্যন্ত সমস্যার সমাধানটা ব্যক্তিগত স্তরেই খুঁজে নিতে হবে!

তথ্যসূত্র:

[1] DePaulo, B. M. (2006) ‘Singled out: How singles are stereotyped, stigmatized and ignored, and still live happily ever after’. New York: St. Martin’s Press.
[2] DePaulo, B. M., & Morris, W. L. (2006) ‘The unrecognized stereotyping and discriminations against singles’. Current Directions in Psychological Science, 15, 251-254.
[3] বেলা ডিপাউলোর ওয়েবসাইট : http://www.belladepaulo.com/
[4] Baron, R. A., & Branscombe, N. R. (2012) ‘Social Psychology’. India: Pearson Education Inc.

images1পোস্ট এর নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা একটা বই এর অনুসরণে!

3

2মায়ের কোল ছেড়ে বেড়িয়ে বাঙালি খোকার স্বপ্নের উড়ান, নাকি বিপদসঙ্কুল পরিবেশে অজানার খোঁজ আর বেঁচে থাকার লড়াই – ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের মূল আকর্ষণ কোনটা? হয়ত দুটোই , কিন্তু বিশ্বসাহিত্যে রোমাঞ্চকর এডভেঞ্চার কাহিনীর তো কমতি নেই, এমনকি বাঙলা সাহিত্য ও এই বিষয়ে মোটের ওপর সমৃদ্ধ, তবুও কিসের খোঁজে এখনো পাঠককূল ছুটে যান বিভূতিভূষণের কাছে?  এই প্রশ্নের ছোট্ট একটা উত্তর আছে, সেটা হলো এক বিশেষ ধরনের ‘জীবনবোধ’ –  নিজের প্রাণ দিয়েও মানুষ আপন করে পেতে চায় তীব্র আকাঙ্খার বস্তুটিকে, সেই আকাঙ্খিত বস্তুটি যত দূরের, তত সুন্দর আর ততই ভয়ংকর – যে বোধ শংকর অর্জন করে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির সামনে দাঁড়িয়ে, সিংহের ডেরায় বা হিংস্র ব্ল্যাক-মাম্বার মুখোমুখি নিরস্ত্র হাতে। তার আকাঙ্খিত বস্তুটিও দুর্জ্ঞেও, জীবনপাত করেও তার দেখা মেলেনা, আবার অবলীলায় ধরা দেয় হাতের মুঠোয়, কিন্তু  তখন হয়ত তুচ্ছ হয়ে যায় তার মূল্য – এই বোধ ছড়িয়ে আছে ‘চাঁদের পাহাড়’ এর পাতায় পাতায়, এবং সেই জন্যই ‘চাঁদের পাহাড়’ আর পাঁচটা এডভেঞ্চার কাহিনীর তুলনায় ‘কিছু বেশি’….

1তো এহেন সমৃদ্ধ একটা গল্পের চলচ্চিত্রায়ন সহজসাধ্য তো  নয় একেবারেই! পরিচালককে লড়তে হবে দর্শকের বিপুল প্রত্যাশার চাপের সঙ্গে, প্রযোজক এর অর্থকরী চাপের সঙ্গে, সর্বপরি নিজের ক্ষমতার সীমার সঙ্গে! এটা ঘটনা যে তিনি যা ই বানান না কেন, কিছু লোক বলবেই যে ‘কিচ্ছু হয়নি’। পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় তাই প্রথমেই একটা মধ্যপন্থা নিয়ে নিয়েছেন, যাতে করে সবচেয়ে বেশি লোকজনকে খুশি করা যায়। একটি আন্তর্জাতিক মানের ছবি বানানোর প্রচেষ্টা থেকে তিনি নিজেকে সযত্নে দূরে রেখেছেন, ঐসব বোধ-ফোধ এর রাস্তায় তিনি হাঁটেননি, মোটামুটি গল্পটাকে গোল করে ‘communicate’ করে দিতে চেয়েছেন যারা আগেই গল্পটা পড়ে রেখেছেন তাদের জন্য, সীমিত বাজেটে যতটা সম্ভব ভালো লোকেশন আর আধুনিক কারিগরী দক্ষতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন নব্য উদীয়মান মাল্টিপ্লেক্স গামী দর্শকদের জন্য, সর্বপরি দেব কে এনে একটা ফাটকা খেলেছেন অন্য আরেকটি শ্রেনীর দর্শককেও একই সঙ্গে ছবিঘরে নিয়ে আসার জন্য। আর এইসব উদ্দেশ্যে তিনি বিশেষভাবে সফল! মূল গল্প থেকে খুব বেশি বিচ্যুত তিনি হননি, উগান্ডা রেলওয়েস এর প্রত্যন্ত স্টেশনের ধারে ইন্দ্রপুরী ষ্টুডিওর ল্যাম্পপোস্ট উঁকি মারেনি, বাঙালি সহশিল্পীরা মুখে কালো রং মেখে আফ্রিকান সাজেননি, উপর্যুপরি পুরো ছবি জুড়ে একটা এডভেঞ্চার-এডভেঞ্চার গন্ধ তিনি টিঁকিয়ে রাখতে পেরেছেন। দেব কে6 এনে অন্য একটি বিশেষ শ্রেনীর দর্শকের বিরাগভাজন তিনি হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, দেব কে এমন কিছু বেমানান ও লাগেনি, এমনকি গলার আওয়াজ তাও খানিকক্ষণ পরে কান-সওয়া হয়ে যায়। পরিচালকের ‘target audience’ এর কাছে কিন্তু এই ছবি উত্সাহ নিয়ে শেষ অব্দি দেখে না ফেলার কোনো আপাত কারণ নেই।

5কিন্তু সচেতন দর্শকের প্রথম সমস্যা হবে ছবিটির গল্প বলার ধরন নিয়ে। গল্পটা সরল করে বুঝিয়ে বলতে গিয়ে background এ সারাক্ষণ ধারাবিবরণীর মত করে বইটি পাঠ হতে থাকে। চলচ্চিত্রভাষার দীনতা? আর কি ই বা বলা যেতে পারে? অবশ্য একটা কায়দা পরিচালক করেছেন, গল্পটা যেন flash-back এ বলা হচ্ছে, কিন্তু তাতে করে স্ক্রিপ্ট এর সাধারণত্ব চাপা থাকেনি! low-light sequence হয়ত সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বৃহত্তর দর্শককুলের কথা ভেবে, এমনকি সাপ ও টর্চ্লাইট্ এর দৃশ্যেও ঘরে প্রচুর আলো, যাবতীয় রহস্যময়তা জলাঞ্জলি দিয়ে জুড়তে হয়েছে ‘বুনিপ’ এর সংহারদৃশ্য, হয়ত দেব এর স্টারডম এর কথা কথা মাথায় রেখেই। আবহসঙ্গীত অত্যন্ত সাধারণ মানের এবং চিত্কৃত! এছাড়া রয়েছে পাহাড়-প্রমান ছোটখাটো ‘inconsistency’ ! কোন চরিত্র কখন কোন ভাষায় কথা বলবে – বাঙলা, হিন্দি, ইংরাজি, সোয়াহিলি নাকি জুলু – সেটা বেশ অনিয়মিত! মাসের পর মাস জঙ্গল পাহাড়ে ঘুরে অনাহারে অর্ধমৃত শংকর এর জামা দেখা গেল প্যান্ট এর তলায় গোঁজা। এইরকম অজস্র…..  

কমালেশ্বরবাবু যদি ‘চাঁদের পাহাড়’ এর বদলে ‘আবার যকের ধন’ বানাতেন তাহলে মনেহয় এত হা-হুতাশের প্রয়োজন হতনা! আসলে এটা ভাবা বেশ গ্লানিকর যে, চলচ্চিত্রগুনে যা হয়ে উঠতে পারত কবিতা, তা শেষমেষ একটা সাধারণ এডভেঞ্চার ছবির চেয়ে বেশি কিছু হলনা! আমরা অপেক্ষা করে রইলাম আরও কোনো শক্তিশালী পরিচালকের আবির্ভাবের জন্য, যিনি হয়ত বিভূতিভূষণের সঙ্গে আবার সুবিচার করবেন!

 4

2

ঋত্বিক কুমার ঘটক – বাঙ্গালী সিনে-বোদ্ধার অধরা মাধুরী, অতুলনীয় সোনার হাঁস, একাধারে যিনি জিনিয়াস বলে ঘোষিত এবং ব্যক্তিগত জীবনে আত্ম-ধ্বংসে প্রবৃত্ত, সত্যজিতের মত অপরিসীম আভিজাত্যের চুড়ায় যার অবস্থান নয়, বরং আর পাঁচটা গড়পরতা বাঙ্গালীর মতই অতিরিক্ত যার আবেগপ্রবণতা – ট্রাজিক হিরোর প্রতি স্বভাব-দুর্বলতার দৌলতে অতএব বাঙালি-রোমান্টিকতার শেষ কথা তিনিই; তাঁর মনন, তাঁর আক্ষেপ বা তাঁর জ্বালাযন্ত্রণার সঙ্গে একাত্ম নাহয় নাই বা হতে পারা গেল!!!! কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এর নতুন ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সেই রোমান্টিকতাই উস্কে দিয়ে গেল।

3নবীন পরিচালক কমলেশ্বর, নিশ্চই তিনি ঋত্বিক ঘটকের অনুগামী, একরকমের দায়বদ্ধতা থেকেই ছবিটি করেছেন বোঝা যায়। ছবির মুখ্য চরিত্রটি ঋত্বিকের আদলে গড়া, নাম নীলকন্ঠ বাগচী, যুক্তি তক্ক গপ্পে ঋত্বিক অভিনীত চরিত্রটির নামে। জীবনযুদ্ধে পরাজিত নীলকন্ঠের ঠাঁই হয় মানসিক চিকিত্সালয়ে, সেখানের মুখ্য চিকিত্সকের সঙ্গে আলাপচারিতায় বেরিয়ে আসে নীলকন্ঠর অতীত, বিপর্যয় ও ব্যর্থতার ইতিহাস। সাধু প্রচেষ্টা, নিঃসন্দেহে। আজকের এই ‘নিরাপদ চলচ্চিত্র’ র যুগে অস্বস্তিকর অতীত নিয়ে নাড়াচাড়া করা কেউই বিশেষ পছন্দ করবেনা জেনেও তিনি এই বিষয়টি বেছে নিয়েছেন, তাতেই বিরাট এক পিঠ-চাপড়ানি তার প্রাপ্য। তারপর – ছবিটির মেয়াদ – সেও প্রায় তিনঘন্টা – আরও একবার প্রমান করে যে পরিচালক কিছুটা নিজের খেয়ালেই ছবিটা বানিয়েছেন! বাঙ্গালুরু শহরের বুকে  ঝাঁ-চকচকে ‘অরিয়ন মলের ‘পিভিআর’ প্রেক্ষাগৃহে আমার পাশে বসা তিনজনের পরিবারটি পরম তৃপ্তিতে বার্গার আর পেপসিতে পেট ভরিয়ে দিব্বি এক ঘুম দিয়ে উঠলেন – ‘ দু ঘন্টা ড্রাইভ করে এসে শেষে এই বই!!!’

কমলেশ্বর কিছু কিছু জায়গায় সচেতনভাবে চেষ্টা করেছেন হাততালি এড়িয়ে যাবার – তার ছবিতে ঋত্বিক কোনো একজন মাতাল ভাঁড় নন, জলজ্যান্ত রক্তমাংসের মানুষ। ছবির ন্যারেটিভ বেশ নাট্যধর্মী, ঋত্বিক ঘটকের জীবনের সঙ্গে যা খুবই মানানসই। কিন্তু হয়ত কিছু কিছু আর্কিটাইপ অবচেতন মনে এতটাই ঢুকে বসে থাকে যে সেগুলো এড়ানো অসম্ভব – অন্তত যে মাত্রার পরিচালক হলে41 সেটা সম্ভব, কমলেশ্বর এখনো সেখানে পৌছননি। কাজেই, মাঠের মধ্যে একটি গাছ, তার মধ্যে লাগানো টেলিফোন, সেটি বাজলে  নার্স এসে ফোনটি তুলছে, পরের দৃশ্যে মানসিক হাসপাতালে নীলকন্ঠর প্রবেশ – এই ধরনের অভিনবত্বহীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘গিমিক’-ধর্মী দৃশ্যের ব্যবহার ছবিটিকে পেছন দিকে টেনে ধরে। স্বাধীনতা-পরবর্তী কম্যুনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ, গণনাট্য সংঘের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং ভাঙ্গন – ঋত্বিকের জীবনের এই বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ অংশটি জাদুঘরের শো-কেসে সাজিয়ে রাখা দলিলের মতই প্রাণহীন। কমলেশ্বর রাজনীতি থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকেননি ঠিকই, কিন্তু বিশেষ গভীরে়ও যাননি। ছবির দ্বিতীয়ার্ধের অনেকটাই আবার ঋত্বিকের বিভিন্ন ছবির অংশবিশেষের কোলাজ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ইঙ্গিত ছাড়াই দৃশ্যগুলো চলে আসে, তাই ঋত্বিকের ছবির সঙ্গে অপরিচিত দর্শক একেবারেই হালে পানি পাননা – পরিণতিতে একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি হিসেবে এই ছবির সম্ভাবনা কমতে থাকে। ঋত্বিকের অসহায়তা, তার কিছু করতে না পারার আক্ষেপ, অনেকটাই মুখে বসানো সংলাপের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত – তায় আবার শেষে আদিবাসী রমনীর নাচের মধ্যে দিয়ে একটি ‘ফিল-গুড’ ফ্যাক্টর, ছবির ‘অভিঘাত’ প্রায় শুন্যে নামিয়ে আনে।

51অভিনয় অংশে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন নীলকন্ঠর স্ত্রীর চরিত্রে অনন্যা চট্টোপাধ্যায়! তার সবচেয়ে বড় গুন হলো যে তিনি কখনই ‘ওহ কি দারুন অভিনয়’ তকমার পেছনে ছোটেন না। এমনকি তাকে আলাদা করে চোখেও পড়েনা, কিন্তু পুরো ব্যাপারটার ‘টোন’ তিনিই সেট করে দেন। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় সু-অভিনেতা, কিন্তু নীলকন্ঠর চরিত্রে তার মেদবহুল শরীর দৃষ্টিপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। এবং যথারীতি শিশু-চরিত্রেরা অতি দুর্বল !!!

বাঙালী সিনে-বোদ্ধার ‘আহা কি দেখিলাম!’ শুনে প্লিজ কমলেশ্বরবাবু, আপনি ভেসে যাবেননা। এক বিরাট প্রত্যাশা জাগিয়ে শুরু করেও এই ছবিতে আপনি হয়ত শেষমেষ পুরোটা সামলে উঠতে পারেননি, কিন্তু ভবিষ্যতে আপনি সাধারণ্যে হারিয়ে যাবেননা এই আশাই করছি।

6

স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকরণ-পদ্ধতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বগত বিরোধ তাঁর একাধিক লেখার উপজীব্য ; ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসটিতে যেমন তিনি কাঠগড়ায় তুলেছিলেন বিংশ শতকের প্রথমার্ধের স্বদেশী আন্দোলনকে, তেমনই ‘চার অধ্যায় ‘ উপন্যাসটির নিশানায় ছিল তত্কালীন বাংলাদেশের সশস্ত্র বিপ্লবের প্রচেষ্টা| রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে পাঠকরা দেখতে পান, সাধারণ দেশবাসীর সুখদুঃখের সঙ্গে সম্পর্করহিত এইসব প্রয়াস কী করে শেষ পর্যন্ত কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খা পূরণেই সার্থক হয়ে উঠতে চায়, অনাগত ভবিষ্যতের সুখস্বপ্নে বিভোর তরুণ -তরুনীরা কিভাবে হয়ে ওঠেন দলনেতার ক্ষমতালিপ্সা চরিতার্থের যন্ত্রবিশেষ ! প্রায় একশ বছর পেরিয়ে এসে রবীন্দ্রনাথের এই বীক্ষণ যে আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে , তা আর পুনরুক্তির অপেক্ষা রাখেনা | এমত পরিস্থিতিতে বাপ্পাদিত্যর মত মননশীল পরিচালক যখন ‘চার অধ্যায় ‘ কে চলচ্চিত্ররূপ দেবার জন্য নির্বাচন করেন , তখন প্রত্যাশা জাগে যে তিনি উপন্যাসের মূল সত্তাটিকে আধুনিক সময়ের নিরিখে নতুনভাবে উপস্থাপন করবেন |

‘চার অধ্যায় ‘ উপন্যাসটি অনেক অংশেই কথোপকথন নির্ভর এবং অবধারিতভাবেই বাঙালি মানস জুড়ে এখনো রয়ে গেছে ‘বহুরুপী’ র প্রযোজনায় শম্ভু ও তৃপ্তি মিত্র অভিনীত মঞ্চসফল নাট্যরূপ টি | বাপ্পাদিত্যর কাছে উপায় ছিল দুটি | সহজতর ছিল উপন্যাসটির মূল বক্তব্য এবং কাহিনীসূত্র টুকু অক্ষুন্ন রেখে একটি সম্পূর্ণ নতুন চিত্রনাট্য লেখা | কিন্তু বাপ্পাদিত্য সেই পথে গেলেন না , হাঁটলেন কঠিন পথটিতে| উপন্যাসের গুরুগম্ভীর কথোপকথন , বাদানুবাদ ইত্যাদি দাঁড়ি কমা সহ তুলে আনলেন পর্দায় , তা সে আধুনিক চলচ্চিত্রের নিরিখে যতই নাটুকে এবং ‘unrealistic’ দেখাক বা শোনাক তার পরোয়া করলেন না , তারপর পুরো ব্যাপারটিকে ‘চলচ্চিত্র -বিশ্বস্ত ‘ করে তুলতে হাতিয়ার করলেন প্রধানত ‘visual’ কে , সঙ্গীত কেও দিলেন প্রাধান্য | ভগ্ন প্রাচীন প্রাসাদে মুন্ড ও লিঙ্গহীন মাতৃমূর্তির কাঠামোর সামনে এলা কালো শাড়িতে চুপচাপ বসে রইলেন , ঘনঘোর রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হেঁটে ও বেড়ালেন , কখনো পাঁচিল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা বটগাছের ঝুরির সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন এবং শেষ দৃশ্যে অগ্নিসজ্জায় blouse-হীন শুয়েও রইলেন | বাপ্পাদিত্য চেষ্টা তো করলেন আপ্রাণ , কিন্তু সফল হলেন আংশিকভাবে |

শুরুটা কিন্তু আশা জাগিয়েই হয়েছিল ! ছোট ছোট দৃশ্যে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো দর্শক কে জানিয়ে দেওয়া , ঝটিতি এলার বিপ্লব প্রীতি এবং অবদমিত যৌনবোধ কে সমান্তরালে প্রতিষ্ঠা করা … বাপ্পাদিত্য বেশ মুন্সিয়ানা দেখাচ্ছিলেন ‘reference’ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও … এলার দেখা বায়স্কোপ এ ‘কর্মা’ ছবির হিমাংশু রায় ও দেবিকারানির চুম্বনদৃশ্য, বা পার্টি র দৃশ্যে ‘drink to me only..’ গানটির ব্যবহার খুবই চমকপ্রদ | কিন্তু যেই ইন্দ্রনাথ প্রবেশ করলেন গল্পে , একের পর এক গুরুগম্ভীর রাবীন্দ্রিক পরিস্থিতির উদ্ভাবনাও শুরু হলো , চরিত্ররা মূলানুরাগী এমন সব বাক্যবন্ধ ব্যবহার শুরু করলেন যেগুলোর কোথায় ‘pause’ পড়বে তা জানতে মাথা খুঁড়তে হয় , যেখানে চা -ওলা কানাইলাল পর্যন্ত বাগ্মীতায় একজন ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ … পরিচালক ভুলতে শুরু করলেন যে এই ছবির পরিচালক রবীন্দ্রনাথ নন , তিনি … ব্যাস , ছবির রাশ আলগা হতে শুরু করলো , শেষ আধ ঘন্টায় কোনকিছুই আর তার আয়ত্তে ছিলনা , পুরো ব্যাপারটাই পরিচালনা করছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ভূত !

বাপ্পাদিত্য আংশিকভাবে সফল ! আত্মকেন্দ্রিক বিপ্লববাদের অসারতা দর্শকদের মধ্যে ‘communicated’ বলাই যায় . এক্ষেত্রে অবশ্য কিছু সুবিধে ছিল , কযেকটি ঘটনা বা কিছু মন্তব্যই আসল কাজটি সেরে দিয়েছে | এলার অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কিছুটা তিনি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন ভাঙ্গা বাড়িতে পাওলি কে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে | কিন্তু অন্তু এলার প্রেম একেবারেই সারা জাগায়না … একটি দৃশ্যে নদীর ঘাটে অন্তুর প্রথম আগমন , পরের দৃশ্যে এলার সুপারিশে অন্তুর দলের সদস্য হওয়া , তার পরেই অন্তু -এলার অন্তরঙ্গ কথোপকথন , যেন বহুদিনের পুরোনো পরিচয় ! আবেগের গড়ে ওঠার ‘চলচ্চিত্র -রুপায়ন ‘ এর কোনো চেষ্টাই করলেন না পরিচালক ! বাকি ছবিটা যে আবেগের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকবে সেটাই ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হলনা . তাই হল থেকে বেরোনোর পর ছবির সেরকম কোনো রেশ ও থেকে গেলনা |

ছবির ‘details’ এ অবশ্য গাফিলতি কম | বাপ্পাদিত্য সচেতনভাবেই যে সমস্ত দৃশ্যে দুর্বলতার সুযোগ আছে সেগুলো এড়িয়ে গেছেন , বিশেষ করে বিপ্লবের ‘ in action’ দৃশ্যাবলী | মাত্র একটা মিছিল তিনি দেখিয়েছেন আর তাতেই কুপোকাত … একটা সাদা কাপড়ে আধুনিক font এ ‘বন্দেমাতরম ‘ প্রিন্ট করে দুজন লোক দুপাশ থেকে ধরে ধরে হেঁটে যাচ্ছে … কী হত এটাও না দেখালে ? তিন সেলের এভার রেডি জীবন সাথী টর্চ অবশ্য প্রথম কবে বেরিয়েছে তা অবশ্য এই সমালোচকের জানা নেই | এলার চরিত্রে পাওলি দাম উল্লেখযোগ্য, তৃপ্তি মিত্রর প্রভাব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত , গুরুভার রাবীন্দ্রিক বাক্যগুলিতে একমাত্র তিনিই সাবলীল ছিলেন | ওই ঘন কৃষ্ণ গাত্রবর্ণ , দীঘল আঁখি , দীর্ঘ দৃপ্ত পদক্ষেপ , সর্বোপরি ফুল -স্লীভ blouse এ পাওলি হয়ে ওঠেন অনন্যা | অন্তু চিত্রনাট্যের দাক্ষিণ্য একেবারেই পাননি , রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলো আউরে যাওয়া ছাড়া তার আর কিছু করার ছিলনা , বটুর ছোট্ট চরিত্রে বরং রুদ্রনীল শারীরিক ভাষায় আলাদা করে নজর কাড়েন, তবে ইন্দ্রনাথ -রুপী ইন্দ্রনীল প্রথম থেকেই খলনায়ক রূপে উপস্থাপিত | ছবির শেষ দৃশ্যটি আরও শারীরিকতা দাবি করে , বোঝা গেলনা পাওলির মত একজন অভিনেত্রী হাতে থাকা সত্ত্বেও বাপ্পাদিত্য কেন আরও সাহসী হতে পারলেন না ! ছবিতে ‘অধ্যায় ‘ এর বিভাজন সেভাবে না থাকায় নাম করন টিও সেভাবে সার্থক হয়ে ওঠেনা |

ছবির শেষে প্রশ্ন থেকেই যায় , বাপ্পাদিত্য ছবিটা করলেন কেন ? রবীন্দ্রনাথের বইটা তো আমরা নিজেরাই পড়ে নিতে পারতাম , চলচ্চিত্রে রূপান্তর ঘটিয়ে কি ‘value add’ করলেন পরিচালক ? ছবির শেষে গান্ধীজির footage ই বা কেন দেখানো হল ? পরিচালক কি এটাই বলতে চান যে বিপ্লববাদের চেয়ে গান্ধীবাদ ভালো ? সেটা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বের পরিপন্থী ! নাকি এটাই ছবির মাধ্যমে বাপ্পাদিত্যর বক্তব্য?