‘গোঁসাই বাগানের ভূত’ প্রথম বেরোয় ১৯৭৭ সালের পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা তে, তখন আমার বয়েস মোটে তিন ( কোনো এক সহৃদয় সাহিত্যপ্রেমী সেই পূজাবার্ষিকীর পাতাগুলো scan করে upload করেছেন, একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে ), আমার হাতে আসে বই আকারে ১৯৮০ তে, আমার প্রথম বইমেলা-র শিকার ওটি, এবং মুষ্টিমেয় যে কয়টি গল্প বারবার পড়ে বড় হয়েছি তার মধ্যে এটি একটি, একটা নাড়ির টান আছেই, তাই ছবিটা দেখতে যাওয়া আমার আদৌ উচিত হয়েছে কিনা সেটা তর্কসাপেক্ষ!
এমনিতে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর দুনিয়া টাকে পর্দায় ধরা যে খুবই কঠিন একটা কাজ তাতে সন্দেহ বড় একটা নেই, এর আগে বেশ কয়েকটা tele-serial হয়েছিল… ‘মনোজদের অদ্ভূত বাড়ি’ প্রায় ওই একই রকমের উঁচু মানের একটা গল্প, যাচ্ছেতাই বানালেও কামু মুখোপাধ্যায় ‘হে দস্যুবর্গ, হাতে নাও খর্গ’ গাইতে গাইতে এগোচ্ছেন, এটুকু অন্তত মনে রাখাতে পেরেছে | বিশাল তারকা সমাবেশ ( উত্পল দত্ত, শেখর চট্টোপাধ্যায়, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় ) নিয়ে ’নৃসিংহ রহস্য’ বলে যে গল্পটা চালানো হয়েছিল তার সঙ্গে আসল এর মিল সামান্যই | আর ‘ঝিলের ধারে বাড়ি’ আলোচনাযোগ্যই নয় | বড় পর্দায় তপন সিনহা ‘আজব গাঁ এর আজব কথা’ য় চূড়ান্ত ব্যর্থ, ঋতুপর্ণ র ‘হীরের আংটি’ ছবি হিসেবে ভালো হলেও তাতে শীর্ষেন্দু-র flavour একেবারেই অনুপস্থিত ছিল… তবে হ্যা, ছবি হয়েছিল বটে ‘পাতালঘর’… ওই একটি ছবিতে বোঝা গিয়েছিল যে হ্যা সম্ভব, শীর্ষেন্দু-র ওই কাল্পনিক দুনিয়া কে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাও সম্ভব | তারওপর এই ছবির পরিচালক নাকি ২৫ বছর আগেই ছবির স্বত্ব কিনে রেখেছিলেন, হয়ত তিনি গল্পটা নিয়ে বেশ passionate, তাই ঝুঁকি মাথায় নিয়েই ছবিটা দেখতে চলে গিয়েছিলাম |
Poster এ মোটকাসোটকা চশমা পরিহিত ছেলেটিকে বা কাঠের মুখোশ পরা কাঞ্চন মল্লিক কে যথাক্রমে বুরুন এবং নিধিরাম হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তবুও
ভেবেছিলাম দেখাই যাক, আমার কল্পনা টা পরিচালকের ওপর নাই বা চাপালাম | প্রথম দিকটা একেবারে মন্দ চলছিল না… সস্তার animation এ হেডস্যার চেচাচ্ছেন জলহস্তির মত, বা চন্দ্রবিন্দু র পরিচালনায় ‘বুরুন তুমি অঙ্কে তের’ মোটামুটি মানিয়ে নিচ্ছিলাম… কিন্তু চূড়ান্ত গোল বাঁধলো অঙ্ক স্যার করালী বাবুর প্রবেশে | পরিচালকের কল্পনায় করালী স্যার একজন ‘ভাঁড়’ বই কিছু নন, যিনি সবসময় অপ্রাসঙ্গিক কিছু কঠিন অঙ্কের নাম আউড়ে যাচ্ছেন.. শুধু তাই নয়, করালী স্যার কে দিয়ে ‘cot by theta’ বলিয়ে পরিচালক ওনাকে অশিক্ষিত ও প্রমান করে ছাড়লেন!!! আসলে কিন্তু চরিত্রটি ছিল একজন আপনভোলা মাস্টার এর, গাঁয়ে-গঞ্জে আগেকার দিনে এনাদের দেখা পাওয়া যেত, যিনি সত্যিই হতেন অঙ্কের পন্ডিত, কিন্তু বাজারে গিয়ে দেড় টাকা কিলো উচ্ছের আড়াইশো গ্রাম এর দাম কত হয় সেটা কিছুতেই হিসেব করে উঠতে পারেন না | পরিচালক এই জাতীয় সূক্ষতা বুঝতে একেবারেই ব্যর্থ! ঠিক যেমনি তিনি ব্যর্থ গল্পের কবিরেজি বনাম আধুনিক চিকিত্সাবিদ্যের দ্বন্দ টা বুঝে উঠতে | ডাকসাইটে রাম কবিরাজ কে তিনি কিনা জড়িবুটি দেওয়া একজন হাতুড়ে বানিয়ে ছাড়লেন! অথচ পরান বন্দোপাধ্যায় এবং ভিক্টর ব্যানার্জী, দুজন শক্তিশালী অভিনেতা এই দুই চরিত্রের জন্য তার হাতেই ছিলেন! এরা দুজন নাহয় চিত্রনাট্যের আনুকুল্য পাননি, কিন্তু যিনি পেয়েও হতাশ করলেন, তিনি হলেন হাবু-রূপী আশীষ বিদ্যার্থী, তার চিত্কৃত উপস্থিতি বারবার ছবি জলদি শেষ হবার কামনা কে তীব্রতর করছিল | পরিচালক এটাও বুঝলেন না যে বাঙ্গালী ভূতেদের ঐরকম রংবেরঙের কিম্ভুতকিমাকার না করলেও চলে, বিশেষ করে শীর্ষেন্দু-র ভূতেদের, খরাজ মুখার্জী তো হাতেই ছিলেন, লুঙ্গি পরিয়ে নিধিরাম সাজিয়ে দিলেই দিব্বি মানিয়ে যেত |
পরিচালক বলতে পারেন আমি আমার কল্পনায় যে ভেবেছি তাই দেখিয়েছি, তুমি কে হে ছোকরা? মেনে নিতাম, যদি ছবিটা অন্তত একটু আকর্ষনীয় হত… অসংলগ্ন চিত্রনাট্য, অপ্রয়োজনীয় দৃশ্যাবলির সমাহার, ওদিকে যেখানে আরও development প্রয়োজন ছিল সেগুলো ফাঁকিবাজি দিয়ে সারা, বিশেষ করে climax এ করালী স্যার এর ‘বুরুন তুমি অঙ্কে তের’-র মন্ত্রে বুরুন এর হাবু-র যাদু কাটিয়ে ওঠা, বা নিধিরাম ও বুরুন এর সম্পর্ক তৈরির দৃশ্যগুলো, বুরুন ভয় পাচ্ছেনা বলেই যে নিধিরাম তাকে তোয়াজ করছে, সেই ব্যাপারটা… আবার চূড়ান্ত inconsistency দেখিয়ে বুরুন অন্য একটি ভূত কে ভয় ও পেয়ে গেল!!!! আসলে হাসির গল্পেও যে একধরনের seriousness থাকে, কার্য-কারন সম্পর্ক টাও যে ঠিকঠাক রাখতে হয়, এই বোধ তো সকলের থাকেনা!
আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্পর্কেও কিছু না বলে পারছি না… আপনি একজন খুব বড় মাপের লেখক, কিন্তু শিশু-কিশোর-কিশোরী দের মনের খবর কতটুকু রাখেন? আপনার ওই সত্তর-আশির দশকে লেখা কিছু গল্প যে সেই সময়ের কিছু পাঠক-পাঠিকার কাছে জীবন মরণের ব্যাপার, সে বোধ ই আপনার নেই! থাকলে এইভাবে নির্বিচারে যোগ্যতা বিচার না করে গল্পগুলো বেচে দিতেন না… আসলে নিজের সৃষ্টি র প্রকৃত মূল্যায়ন করতে আপনিও ব্যর্থ…. তাই শেষমেষ ছবিটাকে ‘একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু’ বলেই লেখাটা শেষ করতে হচ্ছে!
